বিরোধীদের আন্দোলন মোকাবিলা এবং ভোটের প্রচারে দলের সব নেতাকে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে চায় আওয়ামী লীগ। ফলে নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় ঐক্যের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। এরই অংশ হিসাবে নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী ও শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে দলকে তৃণমূল পর্যন্ত শক্তিশালী করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তৃণমূল নেতাদের অনেকেই মনে করেন, বিদ্রোহীদের ক্ষমায় অন্যরাও এ ধরনের কাজে উৎসাহিত হতে পারে। পাশাপাশি শাস্তি হয় না ভেবে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীরা ভবিষ্যতে আবারও নেতিবাচক কাজে জড়াতে ভয় পাবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সবাইকে নয়, অপরাধের ধরন বিবেচনায় নিয়ে ক্ষমা করা উচিত।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক যুগান্তরকে বলেন, অন্যায় করলে একটা রাজনৈতিক দল শাস্তি দেবে, এটাই স্বাভাবিক। আবার সময়ের ব্যবধানে তাকে ক্ষমা করেও দেওয়া যেতে পারে। এটা শুধু রাজনীতি নয়, সব প্রতিষ্ঠানেই আছে। তিনি আরও বলেন, তবে দেখতে হবে অন্যায়টা কী? কোন ধরনের অপরাধ। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে নির্বাচন করলে এক ধরনের অন্যায়। আবার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, খুনখারাবি বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হলে, তা আরেক ধরনের অন্যায়। দলের সিদ্ধান্ত ভঙ্গকারীদের দল ক্ষমা করতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি বা অন্যায় অপরাধ করলে তাদের ক্ষমা করা উচিত নয়। এমন কাউকে ফেরত আনা ঠিক হবে না, তার জন্য দলের ভেতরে বা বাইরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এগুলো বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
একই বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, বহিষ্কার বা অব্যাহতি কোনো শাস্তি নয়। তাছাড়া অন্যায় করে যদি কেউ শাস্তি না পায় বা অন্যায় করে যদি ক্ষমা পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতেও তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হবে। ফলে আমরা একটা ভয়াবহ দিকে ধাবিত হচ্ছি। তিনি আরও বলেন, বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে দিতে চায় না বলে এই ধরনের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদেরও তারা ক্ষমা করে মাঠে নামাচ্ছে।
জানা যায়, দল বা সংগঠনে থেকে দলের বিরুদ্ধে নির্বাচন করা, দলের সঙ্গে নানারকম প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা এবং দলীয় নিয়মনীতি ভঙ্গসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর মধ্যে দলের মন্ত্রী, সিটি করপোরেশনের মেয়র, দলীয় সংসদ-সদস্য, জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ বা গুরুত্বপূর্ণ পদের নেতারাও রয়েছেন। গত ১৭ ডিসেম্বর গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির বৈঠকে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গে অভিযুক্ত নেতাদের ক্ষমা করার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ওইদিন যারা ক্ষমার আবেদন করে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে চিঠি দিয়েছিল, তাদের ক্ষমা করা হয়। অন্যরা আবেদন করলে তাদেরও ক্ষমা করা হবে বলে জানানো হয়।
জানা যায়, ক্ষমা পাওয়া নেতাদের তালিকায় শুধু বিদ্রোহীই নন, সাবেক মন্ত্রী-মেয়রসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাও রয়েছেন। যাদের অনেকের বিরুদ্ধেই গুরুতর অভিযোগ ছিল। এছাড়া ক্যাসিনো-কাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট বর্তমানে জামিনে আছেন। একই ঘটনায় গ্রেফতার সাবেক যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াও জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকেও তখন সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারাও ক্ষমা পাচ্ছেন এবং আবারও দলে ফিরছেন-এমন নানা আলোচনাও রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি মোল্লা মোহাম্মদ আবু কায়সারও বর্তমানে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের ক্ষমার পর অবস্থান কী হবে, তা না নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের আলোচনা ছিল। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য করতে দেখা গেছে। কেউ কেউ বলেছেন, ক্ষমা পেলেও বিদ্রোহীরা ভবিষ্যতে দলের মনোনয়ন বা দলীয় শীর্ষ পদ পাবেন না। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ক্ষমা পাওয়ার পর বিদ্রোহীদের আর আগের পদে যেতে বাধা নেই। ফলে যাদের আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, ক্ষমা পেলে তারা আবার আগের পদে বা শীর্ষ পদ পাবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ যুগান্তরকে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ ছিল, তাদের নিজ পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। এটা ছিল তাদের বিরুদ্ধে দলের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। আবার এখন যাদের ক্ষমা করা হচ্ছে, তাদের কিন্তু আগের পদে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। তারা সাধারণ ক্ষমা পাচ্ছেন। তবে ভবিষ্যতে কেউ কোনো নির্বাচনে বা সম্মেলনে যোগ্যতা বলে পদ বা মনোনয়ন পেতে পারেন, সেখানে তো কোনো বাধা নেই।
নির্বাচনে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী হিসাবে যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাদের অনেকেই দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এলাকায় সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা থাকার পরও নানা হিসাবের মারপ্যাঁচে মনোনয়নবঞ্চিত হন অনেকে। অনেকে আবার দীর্ঘদিন দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেও মনোনয়ন না পেয়ে অভিমান থেকে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যান। স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখতে এবং কর্মী-সমর্থকদের চাপেও অনেকেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকেন। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, তৃণমূলের বহিষ্কার করা নেতাদের বেশির ভাগই দীর্ঘদিন ইউনিয়ন এবং জেলা-উপজেলা কমিটির শীর্ষ পদে নেতৃত্বে ছিলেন। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএস কামাল হোসেন বলেন, আগামী নির্বাচনে দলকে শক্তিশালী এবং সুশৃঙ্খল করার জন্যই বিদ্রোহীদের দলে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর যেহেতু বিএনপি-জামায়াত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তাই আওয়ামী লীগ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করছেন। তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়নি, অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। এখন ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে নির্বাচন সামনে রেখে বিদ্রোহী বা শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের ক্ষমার পর তৃণমূল আওয়ামী লীগে এ নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই মনে করেন, বিদ্রোহীদের ক্ষমা করায় অন্যরা এই কাজে উৎসাহ পাবে। আবার যাদের ক্ষমা করা হয়েছে, তারা আরও বেপরোয়া হবেন। ‘অন্যায় করলে ক্ষমা পাওয়া যায়’ ভেবে ভবিষ্যতেও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে। স্থানীয়ভাবে গ্রুপিংয়ের রাজনীতি আরও চাঙা হবে। এতে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও কমান্ড নষ্ট হওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করেন তারা।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ক্ষমা পেয়েছেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি। তিনি গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছিলেন। তখন তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কার হন। তাকে ক্ষমার চিঠি দেওয়ার পর কারও নাম উল্লেখ না করে তাড়াশ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বাবুল শেখ তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন-‘বিদ্রোহীদের ক্ষমা করলেও এদের মনোভাব বিদ্রোহী থাকবে।’
